HOME আয়নিকরণ বিভব ও ফাজানের নীতি
$P^+$, $Q^{2+}$ এবং $R^{3+}$ তিনটি ক্যাটায়ন যাদের প্রত্যেকটিতে 10টি করে ইলেকট্রন আছে।


[P, Q এবং R প্রচলিত প্রতীক নয়]
Chittagong • 2023
ক) হুন্ডের নীতিটি লেখো।
খ) রাসায়নিক সাম্যাবস্থার গতিশীলতার স্বপক্ষে একটি প্রমাণ দাও।
গ) উদ্দীপক মৌলসমূহের আয়নিকরণ বিভব কীভাবে পরিবর্তিত হয়? ব্যাখ্যা করো।
ঘ) উদ্দীপক ক্যাটায়নসমূহের দ্বারা সৃষ্ট ক্লোরাইড লবণের সমযোজী বৈশিষ্ট্যের ক্রম বিশ্লেষণ করো।

সমাধান (Solution)


ক) হুন্ডের নীতিটি লেখো।

সমশক্তিসম্পন্ন বিভিন্ন অরবিটালে ইলেকট্রনসমূহ এমনভাবে প্রবেশ করে যেন তারা সর্বাধিক সংখ্যায় অয়ুগ্ম বা বিজোড় অবস্থায় থাকতে পারে এবং এই বিজোড় ইলেকট্রনগুলোর স্পিন সর্বদাই একমুখী হয়।

খ) রাসায়নিক সাম্যাবস্থার গতিশীলতার স্বপক্ষে একটি প্রমাণ দাও।

রাসায়নিক সাম্যাবস্থা বাহ্যিকভাবে স্থির মনে হলেও তা আসলে অত্যন্ত গতিশীল। এর অন্যতম অকাট্য প্রমাণ হলো তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের ব্যবহার

হেবার পদ্ধতিতে সাধারণ হাইড্রোজেন ও নাইট্রোজেন গ্যাস ব্যবহার করে বিক্রিয়াটি সাম্যাবস্থায় পৌঁছানোর পর, যদি বাইরে থেকে সামান্য তেজস্ক্রিয় হাইড্রোজেন ($^{3}\text{H}$ বা ট্রাইটিয়াম) মিশ্রিত করা হয়, তবে কিছু সময় পর দেখা যায় যে উৎপন্ন অ্যামোনিয়া গ্যাসও তেজস্ক্রিয় হয়ে উঠেছে ($\text{N}^{3}\text{H}_3$)। সাম্যাবস্থা যদি সম্পূর্ণরূপে স্থবির বা বন্ধ হয়ে যেত, তবে নতুন করে কোনো তেজস্ক্রিয় অ্যামোনিয়া উৎপন্ন হতে পারত না। সম্মুখ ও পশ্চাৎ বিক্রিয়া সমান বেগে অনবরত সচল থাকার কারণেই তেজস্ক্রিয় হাইড্রোজেন উৎপাদে প্রবেশ করতে পেরেছে, যা সাম্যাবস্থার গতিশীলতা প্রমাণ করে।

গ) উদ্দীপক মৌলসমূহের আয়নিকরণ বিভব কীভাবে পরিবর্তিত হয়? ব্যাখ্যা করোer

উদ্দীপকে বর্ণিত ক্যাটায়নসমূহ হলো $\text{P}^+$, $\text{Q}^{2+}$ এবং $\text{R}^{3+}$, যাদের প্রত্যেকটিতে ১০টি করে ইলেকট্রন রয়েছে। ইলেকট্রন সংখ্যার ভিত্তিতে মূল নিষ্ক্রিয় পরমাণু বা মৌলসমূহ ($\text{P, Q, R}$) শনাক্ত করি:
* $\text{P}^+$ ক্যাটায়নে ইলেকট্রন ১০টি; সুতরাং নিরপেক্ষ $\text{P}$ মৌলের ইলেকট্রন সংখ্যা $= 10 + 1 = 11$ (সোডিয়াম, $\text{Na}$)
* $\text{Q}^{2+}$ ক্যাটায়নে ইলেকট্রন ১০টি; সুতরাং নিরপেক্ষ $\text{Q}$ মৌলের ইলেকট্রন সংখ্যা $= 10 + 2 = 12$ (ম্যাগনেসিয়াম, $\text{Mg}$)
* $\text{R}^{3+}$ ক্যাটায়নে ইলেকট্রন ১০টি; সুতরাং নিরপেক্ষ $\text{R}$ মৌলের ইলেকট্রন সংখ্যা $= 10 + 3 = 13$ (অ্যালুমিনিয়াম, $\text{Al}$)

পর্যায় সারণির অবস্থান অনুযায়ী $\text{Na (11), Mg (12), Al (13)}$ মৌল তিনটি ৩য় পর্যায়ের যথাক্রমে গ্রুপ-১, গ্রুপ-২ এবং গ্রুপ-১৩ এর অন্তর্ভুক্ত।

নিচে মৌল তিনটির আয়নিকরণ বিভবের পরিবর্তনের ধারা পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা করা হলো:

১. ইলেকট্রন বিন্যাস বিশ্লেষণ:
$_{11}\text{Na} \rightarrow 1s^2 2s^2 2p^6 3s^1$
$_{12}\text{Mg} \rightarrow 1s^2 2s^2 2p^6 3s^2$
$_{13}\text{Al} \rightarrow 1s^2 2s^2 2p^6 3s^2 3p^1$

২. পর্যায়ভিত্তিক পরিবর্তনের সাধারণ নিয়ম:
আমরা জানি, একই পর্যায়ের বাম থেকে ডান দিকে অগ্রসর হলে পারমাণবিক সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে নিউক্লিয়াসের ধনাত্মক চার্জ বা প্রোটন সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, কিন্তু নতুন কোনো প্রধান শক্তিস্তর যুক্ত হয় না। ফলে নিউক্লিয়াসের প্রতি বহিস্থ স্তরের ইলেকট্রনের আকর্ষণ বল ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায় এবং পরমাণুর ব্যাসার্ধ হ্রাস পায়। ব্যাসার্ধ হ্রাস পাওয়ার কারণে বহিস্থ স্তর থেকে ১টি ইলেকট্রন অসীমে অপসারণ করতে বেশি শক্তির প্রয়োজন হয়, অর্থাৎ আয়নিকরণ বিভবের মান বৃদ্ধি পায়। এই নিয়ম অনুযায়ী আয়নিকরণ বিভবের ক্রম হওয়ার কথা: $\text{Na} < \text{Mg} < \text{Al}$।

৩. ব্যতিক্রমী মেকানিজম ($\text{Mg}$ ও $\text{Al}$ এর তুলনা):
ইলেকট্রন বিন্যাস লক্ষ্য করলে দেখা যায়, $\text{Mg}$ এর সর্ববহিস্থ $3s$ অরবিটালটি ইলেকট্রন দ্বারা পূর্ণ ($3s^2$), যা অত্যন্ত সুস্থিত একটি কাঠামো নির্দেশ করে। পক্ষান্তরে, $\text{Al}$ এর সর্ববহিস্থ $3p$ অরবিটালে মাত্র ১টি ইলেকট্রন রয়েছে ($3p^1$), যা সুস্থিত নয়।

$\text{Mg}$ এর সুস্থিত ও পূর্ণ $3s$ অরবিটাল থেকে ইলেকট্রন অপসারণ করতে যে পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হয়, $\text{Al}$ এর তুলনামূলক কম সুস্থিত এবং নিউক্লিয়াস থেকে দূরবর্তী $3p$ অরবিটাল থেকে ইলেকট্রন সরাতে তার চেয়ে কম শক্তির প্রয়োজন হয়। ফলে $\text{Mg}$ এর আয়নিকরণ বিভব $\text{Al}$ অপেক্ষা বেশি হয়।

সার্বিক আয়নিকরণ বিভবের বাস্তব মান ও ক্রম:
* $\text{Na}$ এর ১ম আয়নিকরণ বিভব $\approx 496 \text{ kJ/mol}$
* $\text{Mg}$ এর ১ম আয়নিকরণ বিভব $\approx 738 \text{ kJ/mol}$
* $\text{Al}$ এর ১ম আয়নিকরণ বিভব $\approx 578 \text{ kJ/mol}$

অতএব, উদ্দীপকের মৌলসমূহের আয়নিকরণ বিভবের পরিবর্তনের সঠিক ক্রমটি হলো: $\text{Na} < \text{Al} < \text{Mg}$ অর্থাৎ $\text{P} < \text{R} < \text{Q}$






ঘ) উদ্দীপক ক্যাটায়নসমূহের দ্বারা সৃষ্ট ক্লোরাইড লবণের সমযোজী বৈশিষ্ট্যের ক্রম বিশ্লেষণ করো।

'গ' হতে প্রাপ্ত উদ্দীপকের ক্যাটায়নসমূহ হলো যথাক্রমে $\text{Na}^+ (\text{P}^+)$, $\text{Mg}^{2+} (\text{Q}^{2+})$ এবং $\text{Al}^{3+} (\text{R}^{3+})$। এরা প্রত্যেকে ক্লোরাইড অ্যানায়ন ($\text{Cl}^-$) এর সাথে যুক্ত হয়ে যথাক্রমে $\text{NaCl}$, $\text{MgCl}_2$ এবং $\text{AlCl}_3$ লবণ গঠন করে।

কোনো আয়নীয় যৌগের মধ্যে সমযোজী বৈশিষ্ট্যের মাত্রা কেমন হবে, তা ফাজানের পোলারন নীতি (Fajans' Rules) এর সাহায্যে পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা করা যায়। ফাজানের নীতি অনুযায়ী, ক্যাটায়ন কর্তৃক অ্যানায়নের ইলেকট্রন মেঘ বিকৃত বা পোলারিত হওয়ার পরিমাণ যত বেশি হবে, ওই আয়নীয় যৌগের মধ্যে সমযোজী বৈশিষ্ট্য তত বৃদ্ধি পাবে।

নিচে ফাজানের সূত্রের আলোকে উদ্দীপকের ক্যাটায়নসমূহের ক্লোরাইড লবণের সমযোজী বৈশিষ্ট্যের ক্রম বিশ্লেষণ করা হলো:

১. ক্যাটায়নের চার্জ বা জারণ অবস্থা (প্রধান ফ্যাক্টর):
ফাজানের প্রথম সূত্রানুযায়ী, ক্যাটায়নের ধনাত্মক চার্জের পরিমাণ যত বৃদ্ধি পায়, তার নিউক্লিয়াসের আকর্ষণ বল তত তীব্র হয় এবং অ্যানায়নকে পোলারিত করার ক্ষমতা (Polarizing power) তত বাড়ে। উদ্দীপকের ক্যাটায়ন তিনটির চার্জের তুলনা নিম্নরূপ:
$\text{Na}^+ < \text{Mg}^{2+} < \text{Al}^{3+}$
যেহেতু $\text{Al}^{3+}$ এর চার্জ সবচেয়ে বেশি ($+3$), তাই এর পোলারন ক্ষমতা সবচেয়ে তীব্র।

২. ক্যাটায়নের আকার:
ক্যাটায়নের আয়নীয় ব্যাসার্ধ যত ছোট হয়, তার পৃষ্ঠতলের চার্জ ঘনত্ব (Charge density) তত বৃদ্ধি পায় এবং অ্যানায়নের ইলেকট্রন মেঘকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা তত বাড়ে। উদ্দীপকের ক্যাটায়নগুলো সম-ইলেকট্রন বিশিষ্ট (Isoelectronic)। এদের প্রত্যেকেরই ইলেকট্রন সংখ্যা ১০।
* $\text{Na}^+$ এর প্রোটন ১১টি, যা ১০টি ইলেকট্রনকে আকর্ষণ করে।
* $\text{Mg}^{2+}$ এর প্রোটন ১২টি, যা ১০টি ইলেকট্রনকে আকর্ষণ করে।
* $\text{Al}^{3+}$ এর প্রোটন ১৩টি, যা ১০টি ইলেকট্রনকে আকর্ষণ করে।
নিউক্লিয়াসের প্রোটন সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধির কারণে ক্যাটায়নসমূহের আকারের ক্রম হয়: $\text{Na}^+ > \text{Mg}^{2+} > \text{Al}^{3+}$। অর্থাৎ, $\text{Al}^{3+}$ আয়নটি আকারে ক্ষুদ্রতম হওয়ায় এর চার্জ ঘনত্ব সর্বোচ্চ।

৩. পোলারন ও সমযোজী বৈশিষ্ট্য রূপান্তর:
যেহেতু ক্যাটায়নসমূহের মধ্যে $\text{Al}^{3+}$ এর আকার ক্ষুদ্রতম এবং চার্জ সর্বোচ্চ, সেহেতু ক্লোরাইড লবণের ক্ষেত্রে $\text{Al}^{3+}$ আয়নটি $\text{Cl}^-$ অ্যানায়নের ইলেকট্রন মেঘকে সবচেয়ে তীব্রভাবে নিজের দিকে টেনে নেয় বা বিকৃত করে। ইলেকট্রন মেঘের এই তীব্র বিকৃতির কারণে আয়নদ্বয়ের মাঝে ইলেকট্রন শেয়ারিং বা ভাগাভাগির অবিকল পরিবেশ তৈরি হয়, যা যৌগে সমযোজী বৈশিষ্ট্যের চমৎকার বিকাশ ঘটায়।

বিপরীতভাবে, $\text{Na}^+$ এর চার্জ কম এবং আকার বড় হওয়ায় এর পোলারন ক্ষমতা নগণ্য, ফলে $\text{NaCl}$ প্রায় খাঁটি আয়নীয় যৌগ হিসেবে আচরণ করে।

লবণসমূহের সমযোজী বৈশিষ্ট্যের ক্রম:
পোলারন ক্ষমতার উচ্চক্রম: $\text{Na}^+ < \text{Mg}^{2+} < \text{Al}^{3+}$
লবণের সমযোজী বৈশিষ্ট্যের ক্রম: $\text{NaCl} < \text{MgCl}_2 < \text{AlCl}_3$ অর্থাৎ $\text{PCl} < \text{QCl}_2 < \text{RCl}_3$





Na⁺

Cl⁻
NaCl (আয়নীয়)


Mg²⁺

Cl⁻
MgCl₂


Al³⁺

Cl⁻
AlCl₃ (সমযোজী)


সমযোজী বৈশিষ্ট্য বৃদ্ধি →







চিত্র: ক্যাটায়নের চার্জ বৃদ্ধি ও আকার হ্রাসের কারণে $\text{Cl}^-$ আয়নের ইলেকট্রন মেঘের পোলারন তথা সমযোজী বৈশিষ্ট্য বৃদ্ধির চিত্ররূপ।





ভৌত ধর্ম দ্বারা সত্যতা যাচাই:
ফাজানের এই পোলারন তত্ত্বের সত্যতা লবণগুলোর গলনাঙ্কের বাস্তব মান দ্বারা প্রমাণিত হয়। সমযোজী বৈশিষ্ট্য বৃদ্ধি পেলে যৌগের গলনাঙ্ক হ্রাস পায়:
* $\text{NaCl}$ এর গলনাঙ্ক $\approx 801^\circ\text{C}$ (বিশুদ্ধ আয়নীয় কাঠামো)
* $\text{MgCl}_2$ এর গলনাঙ্ক $\approx 714^\circ\text{C}$
* $\text{AlCl}_3$ এর গলনাঙ্ক $\approx 192^\circ\text{C}$ (অত্যধিক সমযোজী বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি সহজে উদ্বায়ী হয়)

গাণিতিক সিদ্ধান্ত: ফাজানের নিয়মানুযায়ী ক্যাটায়নের চার্জের উচ্চক্রম ও আকারের নিম্নক্রমের সুনির্দিষ্ট সমন্বয়ের কারণে লবণের সমযোজী বৈশিষ্ট্যের চূড়ান্ত বিন্যাসটি হবে $\text{PCl} < \text{QCl}_2 < \text{RCl}_3$