দুটি পরমাণুর মধ্যে সিগমা বন্ধন গঠিত হওয়ার পর, তাদের অক্ষের সমান্তরালে অবস্থিত দুটি সমশক্তিসম্পন্ন অসংকরিত সমান্তরাল পি-অরবিটাল পরস্পরের সাথে পাশাপাশি উপরিপাতন (Overlapping) ঘটিয়ে যে সহযোজী বন্ধন তৈরি করে, তাকে $\pi$ (পাই) বন্ধন বলে।
খ) $\text{AlCl}_3$ ডাইমার গঠন করে কেন? ব্যাখ্যা করো।
অ্যালুমিনিয়াম ক্লোরাইড ($\text{AlCl}_3$) যৌগে কেন্দ্রীয় অ্যালুমিনিয়াম ($\text{Al}$) পরমাণুর সর্ববহিঃস্থ স্তরে ৩টি ক্লোরিন পরমাণুর সাথে ৩টি সমযোজী বন্ধন গঠনের পর মোট ৬টি ইলেকট্রন থাকে। ফলে অ্যালুমিনিয়ামের যোজনী স্তরে ইলেকট্রন অষ্টক অপূর্ণ থাকে এবং যৌগটি তীব্র ইলেকট্রন ঘাটতিযুক্ত যৌগ (লুইস অ্যাসিড) হিসেবে আচরণ করে।
এই সুস্থিতিহীনতা দূর করতে এবং নিজের অষ্টক পূর্ণ করার লক্ষ্যে গ্যাসীয় বা বাষ্পীয় অবস্থায় দুটি $\text{AlCl}_3$ অণু পরস্পরের কাছাকাছি আসে। তখন প্রতিটি $\text{AlCl}_3$ অণুর ক্লোরিন পরমাণু তার নিজের অব্যবহৃত মুক্তজোড় ইলেকট্রন পাশের অণুর ইলেকট্রন ঘাটতিযুক্ত $\text{Al}$ পরমাণুর খালি $3d$ অরবিটালে দান করে একটি সন্নিবেশ সমযোজী বন্ধন (Coordinate bond) গঠন করে। এভাবে দুটি অণু দ্বিমুখী সন্নিবেশ বন্ধনের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে একটি স্থিতিশীল ডাইমার আণবিক কাঠামো ($\text{Al}_2\text{Cl}_6$) গঠন করে।
গ) E যৌগটির প্রস্তুতি সংশ্লিষ্ট সমীকরণসহ বর্ণনা করো।
উদ্দীপকে উল্লিখিত 'E' যৌগটি খেজুরের রস থেকে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া একটি জৈব অ্যাসিড, যার আণবিক ভর ৬০।
আমরা জানি, এক ক্ষারীয় কার্বক্সিলিক অ্যাসিডের সাধারণ সংকেত: $\text{C}_n\text{H}_{2n+1}\text{COOH}$
এর আণবিক ভর ৬০ হলে:
$12n + 1(2n+1) + 12 + 16 + 16 + 1 = 60$
$=> 14n + 1 + 45 = 60$
$=> 14n + 46 = 60$
$=> 14n = 14$
$=> n = 1$
সুতরাং, যৌগটির সংকেত $\text{CH}_3\text{COOH}$, যা ইথানয়িক অ্যাসিড (অ্যাসিটিক অ্যাসিড) নামে পরিচিত। এর $6\% - 10\%$ জলীয় দ্রবণকে ভিনেগার বলে, যা উদ্দীপকের খাদ্য সংরক্ষক 'E'।
খেজুরের রস (যাতে সুক্রোজ বা চিনি থাকে) থেকে গাঁজন (Fermentation) বা ফার্মেন্টেশন প্রক্রিয়ায় শিল্পক্ষেত্রে ভিনেগার বা ইথানয়িক অ্যাসিড প্রস্তুত করার মেকানিজম নিচে সমীকরণসহ বর্ণনা করা হলো:
১ম ধাপ: সুক্রোজের আর্দ্রবিশ্লেষণ (ইনভার্টেজ এনজাইম):
খেজুরের রসে ম্যাল্ট বা ইস্ট যোগ করলে ইস্ট থেকে নিশ্চিত ইনভার্টেজ (Invertase) নামক এনজাইম খেজুরের রসের সুক্রোজকে আর্দ্রবিশ্লেষিত করে গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজে রূপান্তর করে।
$$\text{C}_{12}\text{H}_{22}\text{O}_{11} (aq) + \text{H}_2\text{O} (l) \xrightarrow{\text{Invertase}} \text{C}_6\text{H}_{12}\text{O}_6 (aq) \text{ [গ্লুকোজ]} + \text{C}_6\text{H}_{12}\text{O}_6 (aq) \text{ [ফ্রুক্টোজ]}$$
২য় ধাপ: ইথানল উৎপাদন (জাইমেজ এনজাইম):
উৎপন্ন গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজের মিশ্রণে ইস্ট থেকে নিঃসৃত অপর এনজাইম জাইমেজ (Zymase) ক্রিয়া করে একে ইথানল ও কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাসে পরিণত করে।
$$\text{C}_6\text{H}_{12}\text{O}_6 (aq) \xrightarrow{\text{Zymase}} 2\text{CH}_3\text{CH}_2\text{OH} (aq) \text{ [ইথানল]} + 2\text{CO}_2 (g)$$
৩য় ধাপ: ইথানলের জারণ (অ্যাসিটোভ্যাক্টর ব্যাকটেরিয়া):
প্রাপ্ত লঘু ইথানল দ্রবণকে ব্যাকটেরিয়ার এক বিশেষ স্ট্রেইন অ্যাসিটোভ্যাক্টর (Acetobacter) এর উপস্থিতিতে $30^\circ\text{C} - 35^\circ\text{C}$ তাপমাত্রায় বায়ুর অক্সিজেন দ্বারা জারিত করলে তা চূড়ান্তভাবে ইথানয়িক অ্যাসিডে রূপান্তরিত হয়।
$$\text{CH}_3\text{CH}_2\text{OH} (aq) + \text{O}_2 (g) \xrightarrow{\text{Acetobacter}} \text{CH}_3\text{COOH} (aq) \text{ [ইথানয়িক অ্যাসিড (E)]} + \text{H}_2\text{O} (l)$$
এই উৎপাদিত ইথানয়িক অ্যাসিডের ঘনমাত্রাকে পানি সহযোগে $6\% - 10\%$ এ নামিয়ে এনে বাণিজ্যিক খাদ্য সংরক্ষক ভিনেগার হিসেবে বোতলজাত করা হয়।
ঘ) E যৌগটি দ্বারা খাদ্য সংরক্ষণ কৌশল বিশ্লেষণ করো।
উদ্দীপকের 'E' যৌগটি হলো ইথানয়িক অ্যাসিড বা ভিনেগার ($\text{CH}_3\text{COOH}$)। এটি খাদ্যবস্তুকে ব্যাকটেরিয়া, মোল্ড বা অন্যান্য অণুজীবের আক্রমণ এবং আণবিক পচন থেকে চমৎকারভাবে রক্ষা করে।
ভিনেগারের খাদ্য সংরক্ষণ কৌশলের মূল মেকানিজমটি প্রধানত এর অম্লীয় পিএইচ ($\text{pH}$) নিয়ন্ত্রণ এবং অণুজীবের বিপাকীয় ক্রিয়া ধ্বংসকরণের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। নিচে এর বিস্তারিত রসায়ন বিশ্লেষণ করা হলো:
১. জলীয় দ্রবণে হাইড্রোজেন আয়নের ($\text{H}^+$) ভূমিকা:
ইথানয়িক অ্যাসিড একটি মৃদু জৈব অ্যাসিড যা জলীয় দ্রবণে আংশিক বিয়োজিত হয়ে হাইড্রোজেন আয়ন বা প্রোটন ($\text{H}^+$) এবং অ্যাসিটেট আয়ন উৎপন্ন করে:
$$\text{CH}_3\text{COOH} (aq) \rightleftharpoons \text{CH}_3\text{COO}^- (aq) + \text{H}^+ (aq)$$
এই অবিরত বিয়োজনের ফলে খাদ্যবস্তুর চারপাশের পরিবেশের $\text{pH}$ হ্রাস পায় এবং তীব্র অম্লীয় পরিবেশ (সাধারণত $\text{pH}$ মান $3.0 - 4.5$ এর মধ্যে) সৃষ্টি হয়। বেশিরভাগ ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া এবং অণুজীবের বংশবৃদ্ধির জন্য অনুকূল $\text{pH}$ হলো প্রায় নিরপেক্ষ বা মৃদু ক্ষারীয় ($6.5 - 7.5$)। ফলে ভিনেগার দ্বারা সৃষ্ট এই উচ্চ অম্লীয় পরিবেশে অণুজীবগুলো বাঁচতে পারে না।
২. অবিয়োজিত অ্যাসিডের কোষঝিল্লি ভেদন ও অণুজীব ধ্বংসকরণ:
ভিনেগারের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, এর জলীয় দ্রবণে বিপুল পরিমাণ ইথানয়িক অ্যাসিড অবিয়োজিত বা আস্ত অণু ($\text{CH}_3\text{COOH}$) হিসেবে বিদ্যমান থাকে। এই চার্জহীন লিপিড-দ্রবণীয় অবিয়োজিত অণুগুলো ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরক্ষামূলক কোষঝিল্লি (Cell membrane) ভেদ করে সহজেই কোষের অভ্যন্তরে (Cytoplasm) প্রবেশ করে।
কোষের ভেতরের পরিবেশের $\text{pH}$ সাধারণত $7.0$ এর কাছাকাছি থাকে। ফলে ব্যাকটেরিয়ার অভ্যন্তরে প্রবেশ করার পর $\text{CH}_3\text{COOH}$ অণুটি দ্রুত বিয়োজিত হয়ে প্রচুর $H^+$ আয়ন মুক্ত করে দেয়। এর ফলে ব্যাকটেরিয়ার অভ্যন্তরীণ অভ্যন্তরীণ $\text{pH}$ মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।
৩. এনজাইম নিষ্ক্রিয়করণ ও মৃত্যু:
কোষের ভেতরের অম্লতা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাকটেরিয়ার জীবন ধারণের জন্য অত্যাবশ্যকীয় এনজাইম ও প্রোটিনসমূহের স্বাভাবিক ত্রিমাত্রিক গঠন ভেঙে যায় (Denaturation ঘটে)। কোষটি তার গাঠনিক সুস্থিতি হারায় এবং বিপাকীয় কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে ব্যাকটিরিয়াটি মারা যায়।
<\div style="\text-align: center; margin: 20px 0;">
উপসংহার:
সার্বিক রাসায়নিক ও আণবিক বিশ্লেষণ থেকে এটি প্রমাণিত হয় যে, ইথানয়িক অ্যাসিড বা ভিনেগার তার তীব্র প্রোটন মোবিলাইজেশন ক্ষমতা ও পিএইচ হ্রাসের অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই খাদ্যদ্রব্যকে ব্যাকটেরিয়ার পচন থেকে দীর্ঘকাল সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হয়।