ক) অবস্থান্তর মৌল কাকে বলে?
যেসব d-ব্লক মৌলের অন্তত একটি সুস্থিত আয়নের ইলেকট্রন বিন্যাসে d-উপস্তরটি ইলেকট্রন দ্বারা আংশিকভাবে পূর্ণ থাকে (অর্থাৎ $d^1$ থেকে $d^9$ বিন্যাস বিন্যাস থাকে), তাদেরকে অবস্থান্তর মৌল বলে। যেমন: আয়রন ($_{26}\text{Fe}$)।
খ) মিথেন অপেক্ষা মিথানলের স্ফুটনাঙ্ক বেশি কেন? ব্যাখ্যা করো।
কোনো যৌগের স্ফুটনাঙ্কের মান তার অণুসমূহের মধ্যকার আন্তঃআণবিক আকর্ষণ বলের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে।
মিথেন ($\text{CH}_4$) একটি অপোলার সমযোজী যৌগ। এর অণুগুলোর মধ্যে কেবল অত্যন্ত দুর্বল আন্তঃআণবিক ভ্যানডার ওয়ালস (Van der Waals) বল কার্যকর থাকে। এই দুর্বল বল ভাঙতে খুব সামান্য তাপশক্তির প্রয়োজন হয়, তাই মিথেনের স্ফুটনাঙ্ক অনেক কম (প্রায় $-161.5^\circ\text{C}$)।
অন্যদিকে, মিথানল ($\text{CH}_3\text{OH}$) একটি পোলার সমযোজী যৌগ। এর অণুতে তীব্র তড়িৎ ঋণাত্মক অক্সিজেন পরমাণুর সাথে হাইড্রোজেন পরমাণু যুক্ত থাকায় ($\text{O}-\text{H}$ বন্ধন) অণুগুলোর মধ্যে অত্যন্ত শক্তিশালী আন্তঃআণবিক হাইড্রোজেন বন্ধন গঠিত হয়। পোলারিটির কারণে মিথানলের অসংখ্য অণু পরস্পরের সাথে হাইড্রোজেন বন্ধনের মাধ্যমে সংগুচ্ছিত (Associated) অবস্থায় থাকে। এই দৃঢ় বন্ধন ভাঙতে প্রচুর তাপশক্তির প্রয়োজন হয়।
উত্তর: অতএব, শক্তিশালী আন্তঃআণবিক হাইড্রোজেন বন্ধনের উপস্থিতির কারণে মিথেন অপেক্ষা মিথানলের স্ফুটনাঙ্ক অনেক বেশি (প্রায় $64.7^\circ\text{C}$) হয়।
গ) $\text{ZX}_3$ যৌগ অপেক্ষা $\text{YX}_3$ যৌগটি অধিক ক্ষারীয়— ব্যাখ্যা করো।
উদ্দীপকের পর্যায় ও শ্রেণিভিত্তিক ছকটি বিশ্লেষণ করে মৌলসমূহ শনাক্ত করি:
১ম পর্যায়ের গ্রুপ-১ এর মৌল $\text{X} = $ হাইড্রোজেন ($_{1}\text{H}$)
২য় পর্যায়ের গ্রুপ-১৫ এর মৌল $\text{Y} = $ নাইট্রোজেন ($_{7}\text{N}$)
৩য় পর্যায়ের গ্রুপ-১৫ এর মৌল $\text{Z} = $ ফসফরাস ($_{15}\text{P}$)
অতএব, $\text{YX}_3$ যৌগটি হলো অ্যামোনিয়া ($\text{NH}_3$) এবং $\text{ZX}_3$ যৌগটি হলো ফসফিন ($\text{PH}_3$)।
লুই মতবাদ অনুসারে, যেসব যৌগ অন্য কোনো পরমাণু বা আয়নকে একাকী ইলেকট্রন যুগল (মুক্তজোড় ইলেকট্রন) দান করতে পারে, তারা লুই ক্ষারক হিসেবে কাজ করে। $\text{NH}_3$ এবং $\text{PH}_3$ উভয়ের কেন্দ্রীয় পরমাণুতেই ১টি করে মুক্তজোড় ইলেকট্রন থাকে। কিন্তু নিচের দুটি প্রধান কারণে $\text{PH}_3$ অপেক্ষা $\text{NH}_3$ এর ক্ষারধর্ম বা মুক্তজোড় ইলেকট্রন দাতার ক্ষমতা অনেক বেশি হয়:
১. পরমাণুর আকার ও আধান ঘনত্ব:
ফসফরাস ($\text{P}$) পরমাণুর তুলনায় নাইট্রোজেন ($\text{N}$) পরমাণুর আকার অনেক ছোট। আকার ছোট হওয়ার কারণে নাইট্রোজেনের বহিঃস্থ স্তরের পৃষ্ঠতলে মুক্তজোড় ইলেকট্রনের আধান ঘনত্ব (Charge density) অনেক বেশি থাকে। ফলে এটি খুব সহজে এবং তীব্রভাবে অন্য কোনো ক্ষারকপ্রার্থীকে (যেমন $\text{H}^+$ আয়ন) ইলেকট্রন জোড় দান করতে পারে। অন্যদিকে, ফসফরাসের আকার বড় হওয়ায় এর মুক্তজোড় ইলেকট্রনটি বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে থাকে, যার ফলে এর আধান ঘনত্ব কম হয় এবং ইলেকট্রন দানের প্রবণতা হ্রাস পায়।
২. তড়িৎ ঋণাত্মকতা:
নাইট্রোজেনের তড়িৎ ঋণাত্মকতার মান ($3.0$) ফসফরাস ($2.1$) অপেক্ষা অনেক বেশি। উচ্চ তড়িৎ ঋণাত্মকতার কারণে $\text{N}-\text{H}$ বন্ধনের ইলেকট্রন মেঘ নাইট্রোজেনের দিকে বেশি ঝুঁকে থাকে, যা কেন্দ্রীয় পরমাণুর ইলেকট্রন ঘনত্ব আরও বাড়িয়ে দেয় এবং মুক্তজোড় ইলেকট্রনটি সহজে মুক্ত হতে সাহায্য করে।
উত্তর: অতএব, ছোট আকার এবং উচ্চ আধান ঘনত্বের কারণে ফসফিন ($\text{PH}_3$) অপেক্ষা অ্যামোনিয়া ($\text{NH}_3$) যৌগটি অধিক ক্ষারীয়।
ঘ) $\text{YK}_3$ ও $\text{YL}_3$ যৌগ দুটির সংকরণ বন্ধন কোণ একই হবে কি? বিশ্লেষণ করো।
'গ' হতে প্রাপ্ত, $\text{Y} = $ নাইট্রোজেন ($\text{N}$)।
ছকের ২য় পর্যায়ের গ্রুপ-১৭ এর মৌল $\text{K} = $ ফ্লোরিন ($_{9}\text{F}$)।
ছকের ৩য় পর্যায়ের গ্রুপ-১৭ এর মৌল $\text{L} = $ ক্লোরিন ($_{17}\text{Cl}$)।
অতএব, $\text{YK}_3$ যৌগটি হলো নাইট্রোজেন ট্রাইফ্লোরাইড ($\text{NF}_3$) এবং $\text{YL}_3$ যৌগটি হলো নাইট্রোজেন ট্রাইক্লোরাইড ($\text{NCl}_3$)।
১. যৌগ দুটির সংকরণ অবস্থা:
$\text{NF}_3$ ও $\text{NCl}_3$ উভয় অণুর কেন্দ্রীয় পরমাণু নাইট্রোজেনের যোজ্যতা স্তরে ৫টি ইলেকট্রন রয়েছে। এর মধ্যে ৩টি বন্ধনজোড় (Bond pair) এবং ১টি মুক্তজোড় (Lone pair) ইলেকট্রন থাকে।
উভয় অণুর ক্ষেত্রে স্টেরিক সংখ্যা (Steric number) $= 3 \text{ (\bond pairs)} + 1 \text{ (lone pair)} = 4$।
সুতরাং, $\text{NF}_3$ ও $\text{NCl}_3$ উভয় অণুর কেন্দ্রীয় পরমাণু নাইট্রোজেনে $sp^3$ সংকরণ ঘটে। $sp^3$ সংকরণের আদর্শ বন্ধন কোণ $109.5^\circ$ এবং আকৃতি চতুস্তলকীয় হওয়ার কথা। কিন্তু VSEPR তত্ত্ব অনুসারে উভয়ের আকৃতি ত্রিকোণাকার পিরামিডীয় হলেও এদের বন্ধন কোণ একই হবে না; এদের মধ্যে ভিন্নতা দেখা যাবে।
২. বন্ধন কোণের ভিন্নতার কারণ বিশ্লেষণ:
* $\text{NF}_3$ এর বন্ধন কোণ ($102.5^\circ$):
$\text{NF}_3$ অণুতে ফ্লোরিনের তড়িৎ ঋণাত্মকতা ($4.0$) কেন্দ্রীয় পরমাণু নাইট্রোজেনের ($3.0$) চেয়ে অনেক বেশি। এর ফলে $\text{N}-\text{F}$ বন্ধনের শেয়ারকৃত ইলেকট্রন যুগল নাইট্রোজেন থেকে দূরে ফ্লোরিন পরমাণুর দিকে গভীরভাবে স্থানান্তরিত হয়। বন্ধনজোড় ইলেকট্রনগুলো নাইট্রোজেন কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যাওয়ায় তাদের মধ্যকার পারস্পরিক বন্ধনজোড়-বন্ধনজোড় (BP-BP) বিকর্ষণ বল ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। এই সুযোগে নাইট্রোজেনের মাথার ওপর থাকা মুক্তজোড় (LP) ইলেকট্রনটি বন্ধনজোড়গুলোকে তীব্র শক্তিতে ভেতরের দিকে চেপে দেয়। ফলে $\text{NF}_3$ এর বন্ধন কোণ আদর্শ কোণ থেকে অনেক বেশি সংকুচিত হয়ে $102.5^\circ$ এ নেমে আসে।
* $\text{NCl}_3$ এর বন্ধন কোণ ($107.1^\circ$):
$\text{NCl}_3$ অণুতে ক্লোরিনের তড়িৎ ঋণাত্মকতা ($3.0$) এবং নাইট্রোজেনের তড়িৎ ঋণাত্মকতা ($3.0$) পরস্পর সমান। ফলে $\text{N}-\text{Cl}$ বন্ধনের শেয়ারকৃত ইলেকট্রন যুগল দুই পরমাণুর ঠিক মাঝখানেই অবস্থান করে, অর্থাৎ নাইট্রোজেন কেন্দ্রের বেশ কাছাকাছি থাকে। ইলেকট্রন জোড়গুলো কেন্দ্রের কাছে থাকায় এদের মধ্যকার পারস্পরিক বন্ধনজোড়-বন্ধনজোড় (BP-BP) বিকর্ষণ বল $\text{NF}_3$ অপেক্ষা অনেক তীব্র হয়। এই তীব্র বিকর্ষণ বল মুক্তজোড় ইলেকট্রনের নিম্নমুখী চাপকে প্রতিহত করে বন্ধনগুলোকে সহজে সংকুচিত হতে দেয় না। এছাড়া ক্লোরিন পরমাণুর আকার বড় হওয়ায় তাদের নিজেদের মধ্যেও একটি স্থানিক বিকর্ষণ (Steric hindrance) কাজ করে। ফলে $\text{NCl}_3$ এর বন্ধন কোণ খুব একটা না কমে $107.1^\circ$ হয়।
গাণিতিক তুলনা:
$\text{NF}_3$ এর বন্ধন কোণ ($102.5^\circ$) $<$ $\text{NCl}_3$ এর বন্ধন কোণ ($107.1^\circ$)
সিদ্ধান্ত: অতএব, পুঙ্খানুপুঙ্খ রাসায়নিক বিশ্লেষণ থেকে প্রমাণিত হয় যে, $\text{YK}_3$ ($\text{NF}_3$) ও $\text{YL}_3$ ($\text{NCl}_3$) যৌগ দুটির কেন্দ্রীয় পরমাণুর সংকরণ একই ($sp^3$) হলেও প্রান্তীয় পরমাণুর তড়িৎ ঋণাত্মকতা ও আকারের পার্থক্যের কারণে এদের বন্ধন কোণ একই হবে না।