ক) খাদ্য সংরক্ষণ কী?
যে বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় খাদ্যদ্রব্যের গুণগত মান, পুষ্টিগুণ, স্বাদ ও বর্ণ অপরিবর্তিত রেখে অণুজীবের (ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ইত্যাদি) আক্রমণ ও এনজাইমের ক্রিয়া থেকে রক্ষা করে দীর্ঘকাল পচনের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখা হয়, তাকে খাদ্য সংরক্ষণ বলে।
খ) $\text{CO}_2$ অণু সরলরৈখিক কেন? ব্যাখ্যা করো।
কার্বন ডাইঅক্সাইড ($\text{CO}_2$) অণুর কেন্দ্রীয় পরমাণু কার্বন ($\text{C}$)। এর যোজ্যতা স্তরের ইলেকট্রন বিন্যাস থেকে দেখা যায় যে, উত্তেজিত অবস্থায় কার্বন পরমাণু তার যোজ্যতা স্তরের একটি $2s$ এবং একটি $2p$ অরবিটালের মিশ্রণে $sp$ সংকরণ বা হাইব্রিডাইজেশন ঘটায়।
$sp$ সংকরণের জ্যামিতিক নিয়ম অনুযায়ী, সংকর অরবিটাল দুটি পরস্পরের বিপরীত দিকে $180^\circ$ কোণে অবস্থান করে। কার্বনের এই দুটি $sp$ সংকর অরবিটাল দুটি অক্সিজেন পরমাণুর $p$ অরবিটালের সাথে মুখোমুখি অতিপায়নের মাধ্যমে দুটি শক্তিশালী $\sigma$ (সিগমা) বন্ধন গঠন করে। কার্বনের অপর দুটি অসংকরিত $p$ অরবিটাল অক্সিজেন দুটির সাথে পার্শ্ববর্তী অতিপায়নের মাধ্যমে দুটি $\pi$ (পাই) বন্ধন গঠন করে।
যেহেতু কেন্দ্রীয় কার্বন পরমাণুর ওপর কোনো মুক্তজোড় (Lone pair) ইলেকট্রন নেই, তাই সিগমা বন্ধন দুটি পরস্পরের সাথে সর্বোচ্চ দূরত্ব বজায় রাখতে $180^\circ$ কোণেই অবস্থান করে। এই সুনির্দিষ্ট জ্যামিতিক বিন্যাসের কারণেই $\text{CO}_2$ অণুর আকৃতি সরলরৈখিক হয়।
গ) আখের রস থেকে 'A'-পাত্রের খাদ্য সংরক্ষকটি প্রস্তুতির মূলনীতি সমীকরণসহ লেখ।
উদ্দীপকের 'A' পাত্রের খাদ্য সংরক্ষকটি হলো $10\%$ অ্যাসিটিক অ্যাসিড বা ইথানয়িক অ্যাসিডের জলীয় দ্রবণ, যা ভিনেগার নামে পরিচিত। আখের রস বা মোলাসেস (চিটাগুড়) থেকে মূলত দুটি ধাপে গাঁজন বা ফার্মেন্টেশন (Fermentation) প্রক্রিয়ায় এটি প্রস্তুত করা হয়। নিচে এর মূলনীতি ও রাসায়নিক সমীকরণ দেওয়া হলো:
১ম ধাপ: অ্যালকোহলীয় গাঁজন (ইথানল উৎপাদন)
আখের রসে প্রধানত সুক্রোজ বা চিনি থাকে। এই রসে তরল ইস্ট (Yeast) যোগ করে $25^\circ\text{C}-30^\circ\text{C}$ তাপমাত্রায় রেখে দিলে ইস্ট থেকে নিঃসৃত ইনভারটেজ (Invertase) এনজাইম সুক্রোজকে আর্দ্রবিশ্লেষিত করে গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজে রূপান্তর করে। পরবর্তীতে ইস্টেরই জাইমেজ (Zymase) এনজাইম গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজকে জারিত করে ইথানল ও কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস উৎপন্ন করে।
সমীকরণ:
$\text{C}_{12}\text{H}_{22}\text{O}_{11} \text{ (Sucrose)} + \text{H}_2\text{O} \xrightarrow{\text{Invertase}} \text{C}_6\text{H}_{12}\text{O}_6 \text{ (Glucose)} + \text{C}_6\text{H}_{12}\text{O}_6 \text{ (Fructose)}$
$\text{C}_6\text{H}_{12}\text{O}_6 \text{ (Glucose/Fructose)} \xrightarrow{\text{Zymase}} 2\text{CH}_3\text{CH}_2\text{OH (Ethanol)} + 2\text{CO}_2 \uparrow$
২য় ধাপ: অ্যাসিটিক অ্যাসিড গাঁজন (ভিনেগার উৎপাদন)
প্রাপ্ত লঘু ইথানল দ্রবণকে মাইকোডার্মা অ্যাসিডি বা অ্যাসিটোভ্যাক্টর (Acetobacter) ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিতে বায়ুপ্রবাহের মাধ্যমে $30^\circ\text{C}-35^\circ\text{C}$ তাপমাত্রায় জারিত করলে তা ইথানয়িক অ্যাসিড বা অ্যাসিটিক অ্যাসিডে পরিণত হয়। এই অ্যাসিডের লঘু জলীয় দ্রবণই ভিনেগার হিসেবে সংগ্রহ করা হয়।
সমীকরণ:
$\text{CH}_3\text{CH}_2\text{OH} + \text{O}_2 \xrightarrow[\text{Acetobacter}]{30^\circ\text{C}-35^\circ\text{C}} \text{CH}_3\text{COOH (Acetic acid)} + \text{H}_2\text{O}$
ঘ) খাদ্য সংরক্ষক হিসাবে উদ্দীপকের 'A' ও 'B' পাত্রের দ্রবণের কৌশল ভিন্ন—ব্যাখ্যা করো।
উদ্দীপকের 'A' পাত্রের দ্রবণটি হলো ভিনেগার ($\text{CH}_3\text{COOH}$ এর জলীয় দ্রবণ) এবং 'B' পাত্রের দ্রবণটি হলো খাদ্য লবণ বা $\text{NaCl}$ এর গাঢ় জলীয় দ্রবণ (ব্রাইন)। উভয়ই খাদ্য সংরক্ষণে ব্যবহৃত হলেও এদের অণুজীব ধ্বংস বা পচন রোধের রাসায়নিক কৌশল সম্পূর্ণ ভিন্ন। নিচে এই ভিন্নতা বিশ্লেষণ করা হলো:
১. 'A' পাত্রের ভিনেগারের সংরক্ষণ কৌশল (pH নিয়ন্ত্রণ ও প্রোটোপ্লাজম ধ্বংস):
ভিনেগারের মূল কার্যকারিতা এর অম্লধর্মের ওপর নির্ভরশীল।
* pH হ্রাস: ভিনেগার জলীয় দ্রবণে আংশিক বিয়োজিত হয়ে হাইড্রোজেন আয়ন ($\text{H}^+$) মুক্ত করে। এর ফলে খাদ্যবস্তুর pH কমে তীব্র অম্লীয় (pH < 4.5) পরিবেশ সৃষ্টি হয়, যা ব্যাকটেরিয়াসহ ক্ষতিকর অণুজীবের বংশবৃদ্ধির জন্য সম্পূর্ণ প্রতিকূল।
$\text{CH}_3\text{COOH} \rightleftharpoons \text{CH}_3\text{COO}^- + \text{H}^+$
* কোষের অভ্যন্তরীণ বিকৃতি: অবিয়োজিত অ্যাসিটিক অ্যাসিড অণুজীবের কোষপ্রাচীর ভেদ করে ব্যাকটেরিয়ার ভেতরে প্রবেশ করে। সেখানে ক্ষারীয় প্রোটোপ্লাজমের সংস্পর্শে এসে এটি প্রচুর $\text{H}^+$ আয়ন মুক্ত করে দেয়। এই অভ্যন্তরীণ অম্লতা ব্যাকটেরিয়ার অতিপ্রয়োজনীয় এনজাইম ও প্রোটিনকে বিকৃত (Denature) করে ফেলে, যার ফলে অণুজীবটি মারা যায়।
২. 'B' পাত্রের লবণের গাঢ় দ্রবণের সংরক্ষণ কৌশল (প্লাজমোলাইসিস ও ডিহাইড্রেশন):
লবণের গাঢ় দ্রবণের সংরক্ষণ কৌশল মূলত ভৌত-রাসায়নিক প্রক্রিয়া তথা অভিস্রাবণ বা অসমোসিস (Osmosis) এর ওপর নির্ভরশীল।
* বহিঃঅভিস্রাবণ: লবণের গাঢ় দ্রবণটি একটি উচ্চ ঘনত্বের অতিপৃক্ত মাধ্যম (Hypertonic solution) হিসেবে কাজ করে। খাদ্যবস্তুকে এই দ্রবণে ডুবিয়ে রাখলে বহিঃঅভিস্রাবণ (Exosmosis) প্রক্রিয়ায় খাদ্যবস্তু এবং তার গায়ে থাকা অণুজীবের ভেদ্য কোষপ্রাচীর ভেদ করে কোষের ভেতরের সমস্ত পানি বাইরে চলে আসে।
* প্লাজমোলাইসিস: পানি হারিয়ে ব্যাকটেরিয়ার কোষগুলো সংকুচিত ও ডিহাইড্রেটেড হয়ে পড়ে, যাকে প্লাজমোলাইসিস বলে। পানির অভাবে অণুজীবের স্বাভাবিক বিপাকীয় ক্রিয়া স্থবির হয়ে যায় এবং তারা মারা পড়ে। তাছাড়া এটি খাদ্যের মুক্ত পানির সক্রিয়তা ($a_w$) কমিয়ে দেয়, যা এনজাইমের পচন ক্রিয়াকে স্তব্ধ করে।
উপসংহার:
অতএব দেখা যাচ্ছে যে, 'A' পাত্রের ভিনেগার প্রধানত রাসায়নিক অম্লতা বৃদ্ধি ও কোষীয় এনজাইম বিকৃতকরণের মাধ্যমে কাজ করে, যেখানে 'B' পাত্রের লবণের গাঢ় দ্রবণ অভিস্রাবণ প্রক্রিয়ায় কোষের পানি নিষ্কাশন ও প্লাজমোলাইসিসের মাধ্যমে খাদ্য সংরক্ষণ করে। অর্থাৎ এদের কার্যকৌশল সম্পূর্ণ ভিন্ন।