আত্মনির্ভরশীলতা ও মানসিক দাসত্ব
দার্শনিক সক্রেটিস বলেছেন, “নিজেকে জানো”। নিজেকে জানা মানে আত্মনির্ভরশীল হওয়া। যে ব্যক্তি আত্মনির্ভরশীল, কোনো মিথ্যা ভয় তাকে পরাভূত করতে পারে না। কিন্তু আজকাল সমাজে প্রায়ই পরাবলম্বনের চিত্র চোখে পড়ে। যার ভিতরে ভয় কাজ করে এবং আত্মনির্ভরশীল নয়, সে মানসিক দাসত্বের শিকার। সে কখনো সমাজের কিংবা মানুষের কল্যাণ সাধন করতে পারে না।
Dhaka • 2025
ক) ‘সম্মার্জনা’ শব্দের অর্থ কী?
খ) ‘এই পরাবলম্বনই আমাদের নিষ্ক্রিয় করে ফেললে।’—ব্যাখ্যা করো।
গ) উদ্দীপকের সাথে ‘আমার পথ’ প্রবন্ধের বক্তব্যগত কী সাদৃশ্য রয়েছে? বুঝিয়ে লেখো।
ঘ) সমাজের উন্নয়নে উদ্দীপক এবং ‘আমার পথ’ প্রবন্ধের মূলবক্তব্য কতটুকু সার্থক বলে তুমি মনে করো?

সমাধান (Solution)

(ক) ‘সম্মার্জনা’ শব্দের অর্থ কী?
‘সম্মার্জনা’ শব্দের অর্থ হলো ঘষে-মেজে পরিষ্কার করা বা পরিমার্জিত করা।

(খ) ‘এই পরাবলম্বনই আমাদের নিষ্ক্রিয় করে ফেললে।’—ব্যাখ্যা করো।
উক্তিটি দ্বারা পরনির্ভরশীলতার কুফল বোঝানো হয়েছে। ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে লেখক দেখিয়েছেন যে, আমরা যখন নিজেদের শক্তি ও সত্যের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে অন্য কোনো নেতার বা ব্যক্তির ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করি, তখন আমাদের নিজস্ব উদ্ভাবনী শক্তি ও আত্মবিশ্বাস লোপ পায়। এই পরনির্ভরশীলতা বা পরাবলম্বন মানুষকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেয় এবং সত্যের পথে চলার উদ্যম কেড়ে নিয়ে তাকে কর্মবিমুখ ও অলস করে তোলে। মূলত আত্মশক্তির অভাবই মানুষকে নিষ্ক্রিয়তার দিকে ঠেলে দেয়।

(গ) উদ্দীপকের সাথে ‘আমার পথ’ প্রবন্ধের বক্তব্যগত কী সাদৃশ্য রয়েছে? বুঝিয়ে লেখো।
উদ্দীপকের ‘নিজেকে জানা’ এবং আত্মনির্ভরশীলতার বিষয়টি ‘আমার পথ’ প্রবন্ধের আত্মাকে চেনার ও আত্মনির্ভরতা অর্জনের দর্শনের সাথে গভীরভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ।

‘আমার পথ’ প্রবন্ধে নজরুল বলেছেন, নিজের সত্যকে জানলে মানুষের মনে এক অজেয় আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। যিনি নিজেকে চেনেন, তিনি মিথ্যার কাছে মাথা নত করেন না এবং তার মধ্যে কোনো মেকি ভয় কাজ করে না। উদ্দীপকের সক্রেটিসের সেই অমর বাণী ‘নিজেকে জানো’ এবং নিজেকে জানার মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার বিষয়টি নজরুলের ‘আমি’কে চেনারই নামান্তর। উদ্দীপকে যেমন বলা হয়েছে যে আত্মনির্ভরশীল ব্যক্তিকে মিথ্যা ভয় পরাভূত করতে পারে না, প্রবন্ধেও লেখক ঠিক একইভাবে আত্মাকে চেনার মাধ্যমে নির্ভীকতা অর্জনের ওপর জোর দিয়েছেন। উভয় ক্ষেত্রেই পরাবলম্বনকে বর্জন করে নিজ শক্তিতে বলীয়ান হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

(ঘ) সমাজের উন্নয়নে উদ্দীপক এবং ‘আমার পথ’ প্রবন্ধের মূলবক্তব্য কতটুকু সার্থক বলে তুমি মনে করো?
সমাজের সার্বিক উন্নয়নে উদ্দীপক এবং ‘আমার পথ’ প্রবন্ধের মূল বক্তব্য—অর্থাৎ ‘আত্মনির্ভরতা ও সত্যের উপাসনা’—অত্যন্ত সার্থক ও অপরিহার্য বলে আমি মনে করি।

একটি সমাজ তখনই উন্নত হয় যখন তার নাগরিকরা স্বকীয়তা বজায় রেখে চলে। ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে লেখক দেখিয়েছেন, পরাবলম্বন আমাদের দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে। উদ্দীপকে উল্লিখিত ‘মানসিক দাসত্ব’ সমাজের অগ্রগতির প্রধান অন্তরায়। যখন কোনো মানুষ নিজেকে চেনে না বা নিজের সত্যের ওপর ভরসা করে না, তখন সে অন্ধভাবে অন্যের অনুসরণ করে, যা সমাজে ভণ্ডামি ও জড়তা তৈরি করে।

সামাজিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন ভীতিহীন চিত্ত এবং সত্যের প্রকাশ। নজরুলের ভাষায়, নিজের সত্যকে কর্ণধার মনে করলে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস পায়। উদ্দীপক ও প্রবন্ধ উভয়ই আমাদের শেখায় যে, আত্মনির্ভরশীলতাই মুক্তি। মানুষ যদি নিজের আত্মাকে চেনে, তবে সে কোনো সংকীর্ণতা বা সাম্প্রদায়িকতার উর্ধ্বে উঠে মানুষের কল্যাণ সাধন করতে পারে। এই আত্মজাগরণই পারে সমাজ থেকে কুসংস্কার, ভীরুতা এবং জড়তা দূর করে একটি শক্তিশালী ও গতিশীল জাতি গঠন করতে।

পরিশেষে বলা যায়, সত্যকে চেনা এবং আত্মনির্ভরশীল হওয়া কেবল ব্যক্তিগত গুণ নয়, বরং এটি সমাজ পরিবর্তনের মূল হাতিয়ার। এই দর্শন সমাজকে শৃঙ্খলমুক্ত করে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে পূর্ণভাবে সার্থক।