ক) সম্পৃক্ত দ্রবণ কাকে বলে?
নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় নির্দিষ্ট পরিমাণের কোনো দ্রাবকে সর্বোচ্চ যে পরিমাণ দ্রব দ্রবীভূত হতে পারে, সেই পরিমাণ দ্রব দ্রবীভূত হয়ে যে দ্রবণ উৎপন্ন হয়, তাকে সম্পৃক্ত দ্রবণ বলে।
খ) $AlF_3$ আয়নিক প্রকৃতির হলেও $AlCl_3$ সমযোজী কেন?
ফাযানের সূত্রানুসারে, ক্যাটায়নের আকার একই থাকলে অ্যানায়নের আকার যত বৃদ্ধি পায়, অ্যানায়নের পোলারায়ন তত বেশি হয় এবং যৌগের সমযোজী ধর্ম বৃদ্ধি পায়। $AlF_3$ এবং $AlCl_3$ উভয় যৌগে ক্যাটায়নটি হলো $Al^{3+}$। কিন্তু অ্যানায়ন দুটির মধ্যে ফ্লোরাইড ($F^-$) আয়নের চেয়ে ক্লোরাইড ($Cl^-$) আয়নের আকার অনেক বড়। ফলে $Al^{3+}$ ক্যাটায়ন দ্বারা $Cl^-$ অ্যানায়নের ইলেকট্রন মেঘের পোলারায়ন তীব্রভাবে ঘটে, যা $AlCl_3$-কে সমযোজী যৌগে পরিণত করে। অন্যদিকে, ছোট আকারের $F^-$ আয়নের পোলারায়ন অতি সামান্য হওয়ায় $AlF_3$ তার বিশুদ্ধ আয়নিক প্রকৃতি বজায় রাখে।
গ) উদ্দীপকের আলোকে আখের রস থেকে C যৌগের উৎপাদন প্রক্রিয়ার মূলনীতি ব্যাখ্যা করো।
উদ্দীপকের সংকেত ও এনজাইমভিত্তিক বিক্রিয়াগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
আখের রস বা সুক্রোজকে ($C_{12}H_{22}O_{11}$) ইনভারটেজ এনজাইম দ্বারা আর্দ্র বিশ্লেষণ করলে গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজের মিশ্রণ 'A' উৎপন্ন হয়। গ্লুকোজ বা ফ্রুক্টোজকে জাইমেজ এনজাইম দ্বারা ফারমেন্টেশন বা গাঁজন করলে ইথানল 'B' ($C_2H_5OH$) উৎপন্ন হয়। পরিশেষে ইথানলকে অক্সিজেন এবং মাইকোডার্মা অ্যাসিট বা অ্যাসিটোব্যাক্টর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিতে জারিত করলে ইথানয়িক অ্যাসিড বা অ্যাসিটিক অ্যাসিড 'C' ($CH_3COOH$) উৎপন্ন হয়।
সুতরাং, 'C' যৌগটি হলো ইথানয়িক অ্যাসিড বা অ্যাসিটিক অ্যাসিড। আখের রস (Molasses) থেকে ভিনেগার বা ইথানয়িক অ্যাসিড উৎপাদনের মূলনীতি নিচে আলোচনা করা হলো:
১. **আর্দ্র বিশ্লেষণ ও ফারমেন্টেশন (ইথানল প্রস্তুতি):** আখের রসের চিটাগুড়কে পানি মিশিয়ে লঘু করা হয় (যাতে সুক্রোজের ঘনমাত্রা ১০-১২% হয়)। এতে সামান্য অ্যামোনিয়াম সালফেট (ব্যাকটেরিয়ার খাদ্য হিসেবে) এবং লঘু সালফিউরিক অ্যাসিড যোগ করে pH ৪.৫-৫.০ এর মধ্যে রাখা হয়। এরপর ঈস্ট (Yeast) যোগ করলে ঈস্ট থেকে নিঃসৃত ইনভারটেজ এনজাইম সুক্রোজকে গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজে পরিণত করে। পরবর্তীতে জাইমেজ এনজাইম উক্ত গ্লুকোজকে ফারমেন্টেশন প্রক্রিয়ায় ইথানলে ($C_2H_5OH$) রূপান্তরিত করে।
২. **অ্যাসিটিক অ্যাসিড ফারমেন্টেশন:** উৎপন্ন ১০-১২% ইথানল দ্রবণকে একটি বিশেষ কাষ্ঠপাত্রে (যা কুইক ভিনেগার প্রসেস নামে পরিচিত) নেওয়ার পর বায়ু চলাচলের সুব্যবস্থা করা হয়। এই দ্রবণে মাইকোডার্মা অ্যাসিট বা অ্যাসিটোব্যাক্টর ব্যাকটেরিয়া যোগ করা হলে বাতাসের অক্সিজেনের উপস্থিতিতে ইথানল জারিত হয়ে ইথানয়িক অ্যাসিড বা ভিনেগারে পরিণত হয়। সাধারণত ২৫-৩৫°C তাপমাত্রায় এই জারণ প্রক্রিয়াটি সবচেয়ে ভালো সম্পন্ন হয়।
ঘ) উদ্দীপকের C यौগের জীবাণুরোধী ক্রিয়ার কৌশল ব্যাখ্যা করো।
উদ্দীপকের 'C' যৌগটি হলো ইথানয়িক অ্যাসিড ($CH_3COOH$), যার ৪-৬% জলীয় দ্রবণকে ভিনেগার বলা হয়। ভিনেগার একটি অত্যন্ত কার্যকর প্রাকৃতিক খাদ্য সংরক্ষক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর জীবাণুরোধী (Antimicrobial) ক্রিয়ার প্রধান রাসায়নিক কৌশল নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. **pH পরিবর্তন ও অনুকূল পরিবেশ ধ্বংস:** খাদ্যবস্তু পচনের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়ার বেঁচে থাকার এবং বংশবৃদ্ধির জন্য একটি নির্দিষ্ট pH (সাধারণত নিরপেক্ষ বা মৃদু ক্ষারীয় পরিবেশ) প্রয়োজন। ভিনেগার তথা ইথানয়িক অ্যাসিড একটি দুর্বল অ্যাসিড হওয়ায় জলীয় দ্রবণে আংশিক বিয়োজিত হয়ে হাইড্রোজেন আয়ন ($H^+$) উৎপন্ন করে।
$CH_3COOH \rightleftharpoons CH_3COO^- + H^+$
এই মুক্ত $H^+$ আয়ন খাদ্যবস্তুর pH দ্রুত কমিয়ে ৩.০ থেকে ৪.৫ এর মধ্যে নিয়ে আসে। এই তীব্র অম্লীয় পরিবেশে ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া বা অণুজীবসমূহ সক্রিয় থাকতে পারে না এবং তাদের বংশবৃদ্ধি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
২. **কোষ প্রাচীর ভেদ ও প্রোটিন বিকৃতকরণ:** ইথানয়িক অ্যাসিডের অবিয়োজিত অংশটি ($CH_3COOH$) লিপিডে দ্রবণীয় হওয়ায় এটি ব্যাকটেরিয়ার কোষ প্রাচীর এবং প্লাজমা মেমব্রেন ভেদ করে অণুজীবের সাইটোপ্লাজমে প্রবেশ করতে পারে।
৩. **অভ্যন্তরীণ বিপাকীয় বিপর্যয়:** ব্যাকটেরিয়ার কোষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার পর কোষের অভ্যন্তরীণ নিরপেক্ষ pH-এর কারণে অবিয়োজিত অ্যাসিডটি বিয়োজিত হয়ে $H^+$ এবং $CH_3COO^-$ আয়ন উৎপন্ন করে। এর ফলে ব্যাকটেরিয়ার অভ্যন্তরীণ pH মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। এই অম্লীয় অবস্থা ব্যাকটেরিয়ার এনজাইম ও অপরিহার্য প্রোটিনগুলোকে বিকৃত (Denature) করে ফেলে এবং মেটাবলিক বা বিপাকীয় প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে। ফলে ব্যাকটেরিয়ার কোষটি মারা যায়।
নিচে ভিনেগারের ব্যাকটেরিয়ানাশক ক্রিয়ার এই সরল মেকানিজমটি চিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
একই সাথে ইথানয়িক অ্যাসিড খাদ্যবস্তুর পানির সক্রিয়তা (Water activity) হ্রাস করে, যা ছাতা বা মোল্ড (Mold) এবং অন্যান্য অণুজীবের আক্রমণকেও প্রতিহত করে। এভাবেই উদ্দীপকের 'C' যৌগ বা ভিনেগার তার শক্তিশালী অণুজীবরোধী ক্ষমতার মাধ্যমে খাদ্যবস্তুকে দীর্ঘকাল পচনের হাত থেকে রক্ষা করে।