বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত বিভিন্ন ক্ষতিকর অম্লীয় গ্যাস (যেমন: $\text{SO}_2, \text{NO}_2$ ইত্যাদি) বৃষ্টির পানির সাথে রাসায়নিকভাবে বিক্রিয়া করে যে খনিজ অ্যাসিড সৃষ্টি করে এবং সেই অ্যাসিড মিশ্রিত পানি যখন বৃষ্টি হিসেবে ভূপাতিত হয়, যার $\text{\pH}$ সাধারণত ৫.৬ এর কম থাকে, তাকে অ্যাসিড বৃষ্টি বলে।
খ) জৈব যৌগে —COOH মূলকের উপস্থিতি শনাক্তকরণের পরীক্ষা সমীকরণসহ লেখো।
জৈব যৌগে কার্বক্সিলিক অ্যাসিড মূলকের ($-\text{COOH}$) উপস্থিতি শনাক্তকরণের সবচেয়ে সহজ ও নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাটি হলো সোডিয়াম বাইকার্বোনেট ($\text{NaHCO}_3$) পরীক্ষা।
পরীক্ষা ও সমীকরণ:
একটি পরিষ্কার টেস্টটিউবে সামান্য পরিমাণ মূল জৈব যৌগের জলীয় দ্রবণের মধ্যে $5\%$ সোডিয়াম বাইকার্বোনেট ($\text{NaHCO}_3$) দ্রবণ যোগ করা হলো। এর ফলে তৎক্ষণাৎ তীব্র বুদবুদসহ বর্ণহীন ও গন্ধহীন কার্বন ডাইঅক্সাইড ($\text{CO}_2$) গ্যাস নির্গত হতে থাকে। এই নির্গত গ্যাসকে চুনের পানির মধ্যে চালনা করলে চুনের পানি ঘোলা হয়ে যায়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে জৈব যৌগে $-\text{COOH}$ মূলকের উপস্থিতি সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়।
গ) উদ্দীপকের C যৌগের নাইট্রেশনে প্রতিস্থাপক অর্থো-প্যারা অবস্থানে যুক্ত হয় না কেন? ব্যাখ্যা করো।
উদ্দীপকের উদ্দীপক চিত্র ও রাসায়নিক রূপান্তর হতে সর্বাগ্রে যৌগসমূহ শনাক্ত করি:
* 'A' যৌগটি হলো একটি বেনজিন বলয় ($\text{C}_6\text{H}_6$)।
* বেনজিনের নাইট্রেশন বিক্রিয়ায় উৎপন্ন 'B' যৌগটি হলো নাইট্রোবেনজিন ($\text{C}_6\text{H}_5\text{NO}_2$)।
* নাইট্রোবেনজিনকে টিন ও গাঢ় হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ($\text{Sn} + \text{HCl}$) দ্বারা বিজারণ করলে উৎপন্ন 'C' যৌগটি হলো অ্যানিলিন বা ফিনাইল অ্যামিন ($\text{C}_6\text{H}_5\text{NH}_2$)।
অ্যানিলিনে অ্যামিনো ($-\text{NH}_2$) মূলক যুক্ত থাকে, যা সাধারণ অবস্থায় বেনজিন বলয় সক্রিয়কারী এবং অর্থো-প্যারা নির্দেশক। কিন্তু তীব্র অম্লীয় মাধ্যমে অ্যানিলিনের নাইট্রেশন বিক্রিয়া ঘটানোর সময় মেকানিজমে এক নাটকীয় রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে। নিচে এর মূল কারণ পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা করা হলো:
১. অ্যানিলিনিয়াম আয়ন ($\text{C}_6\text{H}_5\text{NH}_3^+$) গঠন:
অ্যানিলিনের নাইট্রেশন করার জন্য তীব্র অ্যাসিডের মিশ্রণ (গাঢ় $\text{HNO}_3$ + গাঢ় $\text{H}_2\text{SO}_4$) ব্যবহার করা হয়। আমরা জানি, অ্যানিলিনের $-\text{NH}_2$ মূলকের নাইট্রোজেন পরমাণুতে একটি একাকী মুক্তজোড় ইলেকট্রন থাকে, যার কারণে এটি ক্ষারীয় ধর্ম প্রদর্শন করে। তীব্র অম্লীয় মাধ্যমে মিশ্রণ থেকে প্রাপ্ত উচ্চ ঘনমাত্রার প্রোটন ($\text{H}^+$) অ্যানিলিনের মুক্তজোড় ইলেকট্রন দ্বারা তীব্রভাবে আক্রান্ত হয়। এর ফলে অ্যামিনো মূলকটি প্রোটন গ্রহণ করে ধনাত্মক চার্জযুক্ত অ্যানিলিনিয়াম আয়নে ($\text{C}_6\text{H}_5\text{NH}_3^+$) রূপান্তরিত হয়ে যায়।
২. মেটা নির্দেশক চরিত্রে রূপান্তর:
অ্যানিলিনিয়াম আয়নের নাইট্রোজেন পরমাণুটি ধনাত্মক চার্জযুক্ত ($\text{N}^+$) হওয়ায় এটি বেনজিন বলয় থেকে তীব্র আবেশ প্রক্রিয়ায় (Inductive effect) ইলেকট্রন মেঘ নিজের দিকে টেনে নেয়। এর ফলে বেনজিন বলয়ে ইলেকট্রনের ঘনত্ব মারাত্মকভাবে হ্রাস পায় এবং বলয়টি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
এই ইলেকট্রন আকর্ষণের কারণে বলয়ের অর্থো ($\mathit{o}-$) এবং প্যারা ($\mathit{p}-$) অবস্থানে ইলেকট্রন ঘনত্ব মেটা ($\mathit{m}-$) অবস্থানের তুলনায় অনেক বেশি হ্রাস পায়। অর্থাৎ, মেটা অবস্থানটি অর্থো ও প্যারার তুলনায় আপেক্ষিকভাভে কিছুটা বেশি ইলেকট্রন সমৃদ্ধ থাকে।
৩. ফলাফল:
যেহেতু নাইট্রেশন বিক্রিয়ার মূল আক্রমণকারী বিকারক হলো একটি ইলেকট্রনকর্ষী বা ইলেকট্রোফাইল আয়ন ($\text{NO}_2^+$), সেহেতু এটি ইলেকট্রন ঘাটতিযুক্ত অর্থো বা প্যারা অবস্থানে আক্রমণ করতে না পেরে আপেক্ষিক ইলেকট্রন সমৃদ্ধ মেটা অবস্থানে আক্রমণ করে। এই কারণে অ্যানিলিনের নাইট্রেশনে প্রধান উৎপাদ হিসেবে অর্থো-প্যারা যৌগ গঠিত না হয়ে প্রায় $47\%$ মেটা-নাইট্রোঅ্যানিলিন উৎপন্ন হয়।
<\div style="\text-align: center; margin: 20px 0;">
চিত্র: অম্লীয় মাধ্যমে অ্যানিলিনিয়াম আয়ন গঠন এবং এর ফলশ্রুতিতে মেটা অবস্থানে ইলেকট্রোফিলিক প্রতিস্থাপন।
\div>
ঘ) উদ্দীপকের A, B ও C যৌগের ক্ষেত্রে ইলেকট্রনকর্ষী প্রতিস্থাপন বিক্রিয়ার সক্রিয়তার ক্রম বিশ্লেষণ করো।
উদ্দীপক হতে প্রাপ্ত যৌগ তিনটি হলো:
* $\text{A} \rightarrow$ বেনজিন ($\text{C}_6\text{H}_6$)
* $\text{B} \rightarrow$ নাইট্রোবেনজিন ($\text{C}_6\text{H}_5\text{NO}_2$)
* $\text{C} \rightarrow$ অ্যানিলিন ($\text{C}_6\text{H}_5\text{NH}_2$)
বেনজিন বলয়ে ইলেকট্রনকর্ষী বা ইলেকট্রোফিলিক প্রতিস্থাপন বিক্রিয়ার ($\text{S}_E$ বিক্রিয়া) গতিবেগ এবং সক্রিয়তা বলয়ে যুক্ত মূলকের ইলেকট্রন দান বা আকর্ষণ করার ক্ষমতার ওপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। রেজোন্যান্স (Mesomeric effect) এবং আবেশীয় (Inductive effect) প্রভাবের আলোকে যৌগ তিনটির সক্রিয়তার তুলনামূলক বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:
১. অ্যানিলিন ($\text{C}_6\text{H}_5\text{NH}_2$ - যৌগ C) এর সক্রিয়তা:
অ্যানিলিনের $-\text{NH}_2$ মূলকের নাইট্রোজেন পরমাণুতে একটি অবন্ধনযুক্ত মুক্তজোড় ইলেকট্রন থাকে। এই মুক্তজোড় ইলেকট্রনটি বলয়ের পাই ($\pi$) ইলেকট্রন সিস্টেমের সাথে রেজোন্যান্সে অংশ নেয় এবং প্লাস মেসোমেরিক ($+M$) প্রভাবের মাধ্যমে বলয়ের ভেতর ইলেকট্রন ঘনত্ব অসাধারণভাবে বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে অর্থো ও প্যারা অবস্থানে ইলেকট্রন মেঘের ঘনত্ব অনেক বেশি হয়। বলয়ে ইলেকট্রন ঘনত্ব বৃদ্ধির কারণে যেকোনো আগত ইলেকট্রোফাইল ($\text{E}^+$) অত্যন্ত দ্রুত ও সহজে বলয়কে আক্রমণ করতে পারে। তাই অ্যানিলিন একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বলয় সক্রিয়কারী যৌগ।
২. বেনজিন ($\text{C}_6\text{H}_6$ - যৌগ A) এর সক্রিয়তা:
বেনজিন বলয়ে কোনো প্রতিস্থাপক মূলক যুক্ত থাকে না। এর ছয়টি কার্বনে ছয়টি পাই ($\pi$) ইলেকট্রন সুষমভাবে আবর্তন করে। এতে ইলেকট্রন ঘনত্ব বৃদ্ধির বা হ্রাসের কোনো বাহ্যিক প্রভাব নেই। ফলে এর সক্রিয়তাকে আদর্শ বা প্রমাণ মান হিসেবে ধরা হয়। এটি নাইট্রোবেনজিনের চেয়ে দ্রুত কিন্তু অ্যানিলিনের চেয়ে অনেক ধীরগতিতে ইলেকট্রোফিলিক প্রতিস্থাপন বিক্রিয়া প্রদর্শন করে।
৩. নাইট্রোবেনজিন ($\text{C}_6\text{H}_5\text{NO}_2$ - যৌগ B) এর সক্রিয়তা:
নাইট্রোবেনজিনের নাইট্রো ($-\text{NO}_2$) মূলকটি অত্যন্ত শক্তিশালী ইলেকট্রন আকর্ষক মূলক। এর নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন পরমাণুর উচ্চ তড়িৎঋণাত্মকতার কারণে এটি মাইনাস মেসোমেরিক ($-M$) এবং মাইনাস আবেশীয় ($-I$) প্রভাবের সাহায্যে বেনজিন বলয় থেকে ইলেকট্রন মেঘ তীব্রভাবে নিজের দিকে টেনে নেয়। এর ফলে বেনজিন বলয়ে ইলেকট্রনের ঘনত্ব মারাত্মকভাবে হ্রাস পায় এবং বলয়টি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। বলয়ে ইলেকট্রনের তীব্র ঘাটতি থাকায় কোনো ইলেকট্রোফাইল সহজে একে আক্রমণ করতে পারে না। বিক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রা ও প্রভাবকের প্রয়োজন হয়। তাই নাইট্রোবেনজিন একটি বলয় নিষ্ক্রিয়কারী যৌগ।