ক) ইলেকট্রন আসক্তির সংজ্ঞা দাও।
গ্যাসীয় অবস্থায় কোনো মৌলের এক মোল বিচ্ছিন্ন পরমাণুর সর্ববহিঃস্থ স্তরে এক মোল ইলেকট্রন প্রবেশ করিয়ে এক মোল একক ঋণাত্মক আধানযুক্ত আয়নে পরিণত করতে যে পরিমাণ শক্তি নির্গত হয়, তাকে সেই মৌলের ইলেকট্রন আসক্তি বলে।
খ) আয়োডিনের ভৌত অবস্থা কঠিন কেন? ব্যাখ্যা করো।
আয়োডিন ($\text{I}_2$) হলো পর্যায় সারণির গ্রুপ-১৭ এর একটি হ্যালোজেন মৌল, যা বিশুদ্ধ অপোলার সমযোজী অণু হিসেবে অবস্থান করে। অপোলার সমযোজী অণুসমূহের মধ্যে কেবল অত্যন্ত দুর্বল আন্তঃআণবিক ভ্যানডার ওয়ালস (Van der Waals) আকর্ষণ বল কার্যকর থাকে।
ভ্যানডার ওয়ালস বলের তীব্রতা মূলত অণুর আকার এবং আণবিক ভরের ওপর নির্ভর করে। অণুর আকার ও ভর যত বৃদ্ধি পায়, তার ইলেকট্রন মেঘের পোলারায়ন ক্ষমতা তত বাড়ে এবং ভ্যানডার ওয়ালস আকর্ষণ বলের মানও তত শক্তিশালী হয়। হ্যালোজেন গ্রুপের উপর থেকে নিচে ($\text{F}_2 \rightarrow \text{Cl}_2 \rightarrow \text{Br}_2 \rightarrow \text{I}_2$) নামলে অণুর আকার ও আণবিক ভর ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায়। আয়োডিন অণুর আকার ও পারমাণবিক ভর এই গ্রুপের অন্যান্য সাধারণ মৌলের চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় এর অণুগুলোর মধ্যকার ভ্যানডার ওয়ালস আকর্ষণ বল অত্যন্ত শক্তিশালী হয়। এই শক্তিশালী আকর্ষণের কারণে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আয়োডিনের অণুসমূহ পরস্পরের খুব কাছাকাছি ঘনসন্নিবিষ্ট অবস্থায় থাকে। এই কারণেই স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আয়োডিনের ভৌত অবস্থা কঠিন হয়।
গ) উদ্দীপকের A যৌগ অপেক্ষা B যৌগের গলনাঙ্ক বেশি— কারণ আলোচনা করো।
উদ্দীপকের উদ্দীপনা ও শর্তানুসারে, 'A' এবং 'B' যথাক্রমে ৩য় ও ৪র্থ পর্যায়ের ক্ষার ধাতুর নাইট্রেট লবণ।
পর্যায় সারণির ৩য় পর্যায়ের গ্রুপ-১ এর ক্ষার ধাতুটি হলো সোডিয়াম ($\text{Na}$) এবং ৪র্থ পর্যায়ের ক্ষার ধাতুটি হলো পটাশিয়াম ($\text{K}$)।
অতএব,
যৌগ A হলো সোডিয়াম নাইট্রেট ($\text{NaNO}_3$)
যৌগ B হলো পটাশিয়াম নাইট্রেট ($\text{KNO}_3$)
ধাতব হ্যালাইড বা লবণের গলনাঙ্কের মান ক্যাটায়নের পোলারায়ন ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, যা ফাজানের নীতি (Fajans' Rules) দ্বারা নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। ফাজানের নীতি অনুযায়ী, অ্যানায়ন একই থাকলে ক্যাটায়নের চার্জ যত বেশি হয় এবং ক্যাটায়নের আকার যত ছোট হয়, তার আধান ঘনত্ব ও পোলারায়ন ক্ষমতা তত বৃদ্ধি পায়। ক্যাটায়নের পোলারায়ন ক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে যৌগের মধ্যে সমযোজী বৈশিষ্ট্য বাড়ে এবং আয়নিক বৈশিষ্ট্য হ্রাস পাওয়ায় গলনাঙ্কের মান কমে যায়।
যৌগ $\text{NaNO}_3$ এবং $\text{KNO}_3$ উভয়ের মধ্যেই সাধারণ অ্যানায়ন হিসেবে নাইট্রেট ($\text{NO}_3^-$) আয়ন বিদ্যমান। কিন্তু এদের ক্যাটায়দ্বয় যথাক্রমে $\text{Na}^+$ এবং $\text{K}^+$।
১. একই গ্রুপে উপর থেকে নিচে নামলে পরমাণুর নতুন শক্তিস্তর যুক্ত হওয়ার কারণে ক্যাটায়নের আকার বৃদ্ধি পায়। সেই হিসেবে $\text{Na}^+$ আয়নের চেয়ে $\text{K}^+$ আয়নের পারমাণবিক ব্যাসার্ধ বা আকার বড়।
২. ক্যাটায়নের আকার ছোট হওয়ায় $\text{Na}^+$ আয়নের পৃষ্ঠতলের আধান ঘনত্ব $\text{K}^+$ অপেক্ষা অনেক বেশি হয়। উচ্চ আধান ঘনত্বের কারণে $\text{Na}^+$ আয়নটি নাইট্রেট অ্যানায়নের ইলেকট্রন মেঘকে তীব্রভাবে নিজের দিকে বিকৃত বা পোলারায়িত করতে পারে।
৩. ফলে ফাজানের নীতি অনুযায়ী $\text{NaNO}_3$ যৌগে সমযোজী বৈশিষ্ট্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায়।
৪. অন্যদিকে, $\text{K}^+$ আয়নের আকার বড় হওয়ায় এর পোলারায়ন ক্ষমতা বেশ কম হয়, যার দরুন $\text{KNO}_3$ যৌগে সমযোজী বৈশিষ্ট্য খুব একটা প্রকাশ পায় না এবং এটি বিশুদ্ধ ও দৃঢ় আয়নিক কেলাস হিসেবে অবস্থান করে।
আমরা জানি, আয়নিক বন্ধন সমযোজী বন্ধন অপেক্ষা অনেক বেশি শক্তিশালী ও সুস্থিত। $\text{KNO}_3$ এর তীব্র আয়নিক কেলাস কাঠামো ভাঙতে $\text{NaNO}_3$ অপেক্ষা অনেক বেশি তাপশক্তির প্রয়োজন হয়।
উত্তর: অতএব, পোলারায়ন কম এবং আয়নিক প্রকৃতির দৃঢ়তার কারণে উদ্দীপকের A যৌগ ($\text{NaNO}_3$) অপেক্ষা B যৌগের ($\text{KNO}_3$) গলনাঙ্ক বেশি হয়।
ঘ) উদ্দীপকের A, C ও D রেখার বক্রতার কারণ বিশ্লেষণ করো।
উদ্দীপকের গ্রাফটিতে তাপমাত্রা পরিবর্তনের সাথে সাথে বিভিন্ন কঠিন পদার্থের দ্রাব্যতা (g/100g $\text{H}_2\text{O}$) পরিবর্তনের লেখচিত্র বা দ্রাব্যতা রেখা (Solubility curves) প্রদর্শিত হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট পদার্থের দ্রাব্যতা তাপমাত্রার পরিবর্তনের ওপর কীভাবে সাড়া দেয়, তার ওপর ভিত্তি করে এই রেখাগুলোর আকৃতি ও বক্রতা নির্ধারিত হয়। নিচে A, C ও D রেখার বক্রতার সুনির্দিষ্ট রাসায়নিক কারণ বিশ্লেষণ করা হলো:
১. A রেখার বক্রতার কারণ (তাপহারী প্রক্রিয়া):
লেখচিত্রে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে 'যৌগ A' ($\text{NaNO}_3$) এর দ্রাব্যতা রেখাটি খাড়াভাবে উপরের দিকে ধাবিত হয়েছে। সোডিয়াম নাইট্রেটের পানিতে দ্রবীভূত হওয়ার প্রক্রিয়াটি একটি তাপহারী (Endothermic) প্রক্রিয়া।
$\text{NaNO}_3(s) + \text{H}_2\text{O}(l) \rightleftharpoons \text{Na}^+(aq) + \text{NO}_3^-(aq) ; \Delta H = \text{+ve}$
লা-শাতেলিয়ারের নীতি অনুসারে, তাপহারী বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে সাম্যাবস্থায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি করলে সিস্টেম অতিরিক্ত তাপ শোষণ করার জন্য বিক্রিয়াটি সম্মুখ অভিমুখে অগ্রসর হয়। ফলে তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে দ্রবণে লবণের দ্রাব্যতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই কারণেই 'A' রেখাটি খাড়া ঊর্ধ্বমুখী বক্রতা প্রদর্শন করে।
২. C রেখার বক্রতার কারণ (তাপোৎপাদী প্রক্রিয়া):
লেখচিত্রে দেখা যাচ্ছে যে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে 'যৌগ C' এর দ্রাব্যতা প্রথমে সামান্য বৃদ্ধি পেলেও পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে। এই ধরনের বক্রতা সাধারণত ক্যালসিয়াম সালফেট ($\text{CaSO}_4$) বা সেরিয়াম সালফেট [$\text{Ce}_2(\text{SO}_4)_3$] এর মতো যৌগের ক্ষেত্রে দেখা যায়, যাদের পানিতে দ্রবীভূত হওয়ার সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি তাপোৎপাদী (Exothermic)।
$\text{Compound C}(s) + \text{H}_2\text{O}(l) \rightleftharpoons \text{Ions}(aq) + \text{Heat} ; \Delta H = \text{-ve}$
লা-শাতেলিয়ারের নীতি অনুযায়ী, তাপোৎপাদী প্রক্রিয়ায় তাপমাত্রা বাড়ালে সাম্যাবস্থা পশ্চাৎমুখী হয়, অর্থাৎ লবণের দ্রাব্যতা হ্রাস পেতে থাকে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে দ্রবীভূত লবণ পুনরায় কেলাসিত হয়ে নিচে জমা হয় বিধায় 'C' রেখাটি নিচের দিকে বেঁকে অবতল বক্রতা সৃষ্টি করে।
৩. D রেখার সরলরৈখিকতার কারণ (তাপ নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া):
লেখচিত্রে 'যৌগ D' এর রেখাটি প্রায় আনুভূমিক এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে এর কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটেনি, এটি একটি সরলরেখা। এই রেখাটি মূলত খাদ্য লবণ বা সোডিয়াম ক্লোরাইড ($\text{NaCl}$) কে নির্দেশ করে।
সোডিয়াম ক্লোরাইড যখন পানিতে দ্রবীভূত হয়, তখন কেলাস ভাঙার জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাটিস শক্তি এবং আয়নসমূহের হাইড্রেশন শক্তির মান প্রায় সমান হয়। ফলে এই প্রক্রিয়ায় তাপের শোষণ বা উদগিরণ ঘটে না বললেই চলে ($\Delta H \approx 0$)। যেহেতু প্রক্রিয়াটি তাপীয়ভাবে প্রায় নিরপেক্ষ, সেহেতু লা-শাতেলিয়ারের নীতি অনুসারে তাপমাত্রা বাড়ালে বা কমালে এর সাম্যাবস্থার ওপর কোনো প্রভাব পড়ে না। এই কারণেই 'D' রেখাটির কোনো বক্রতা নেই এবং এটি তাপমাত্রা অক্ষের সমান্তরালে সরলরৈখিক থাকে।
উপসংহার:
অতএব, উপরোক্ত বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয় যে, পানিতে বিভিন্ন লবণের দ্রবীভূত হওয়ার সময়কার তাপীয় পরিবর্তনের ভিন্নতার (তাপহারী, তাপোৎপাদী ও তাপ নিরপেক্ষ) কারণেই উদ্দীপকের A, C ও D রেখার বক্রতা পরস্পরের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির হয়ে থাকে।